Monday, 29 April 2013

জেনেভায় প্রশ্নের মুখে পররাষ্ট্রমন্ত্রী

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক :  জাতিসংঘের সদর দপ্তর জেনেভায় বাংলাদেশের মানবাধিকার বিষয়ক দ্বিতীয় পর্যালোচনা সভায় সাভারের ভবন ধসে কয়েকশ শ্রমিক নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে অনেক অপ্রীতিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনিকে। সোমবার দিনব্যাপী শুনানিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের মানবাধিকার বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। জেনেভা থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তি থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, সাভারের ভবন ধসের ঘটনায় তিন শতাধিক পোশাক শ্রমিকের মৃত্যু বাংলাদেশের শ্রমিকদের অধিকারের বিষয়টিসহ বহু অপ্রীতিকর প্রশ্নের মুখোমুখি হন  জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থায়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ না হওয়া, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে প্রশাসনিক বাধা সৃষ্টি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার অভাব, নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি না হওয়া, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর চালানো সহিংসতা এবং ক্ষুদ্র জাতিসত্তার সম-অধিকার ইত্যাদি।

এছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগ কতটা বিবেচনায় নেওয়া হয়, সেটিও তুলে ধরা হয়। এ শুনানি জেনেভায় জাতিসংঘ দপ্তরে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতি চারবছর বিরতিতে মানবাধিকার পরিস্থিতির সর্বজনীন পরিবীক্ষণ যা ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউ (ইউপিআর) নামে পরিচিত। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের আয়োজনে প্রতি চার বছর পর পর পৃথিবীর সব দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনার এ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০০৯ সালে এবং এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় ইউপিআর। জাতিসংঘের এটিই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যার আওতায় বিশ্বের ১৯৩টি সদস্য রাষ্ট্রের সবার মানবাধিকার পরিস্থিতি একবার পরিবীক্ষণ সম্পন্ন হয়েছে। সোমবারের পর্যালোচনায় বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, দেশি-বিদেশি ও বৈশ্বিক মানবাধিকার সংগঠন, বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন, উন্নয়ন সংস্থা এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের সদস্য ৪৭টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি। সাড়ে তিন ঘণ্টা মানবাধিকার বিষয়ে

এ সব উত্থাপিত প্রশ্ন ও মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে ডা. দীপু মনি মানবতাবিরোধী  অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারের প্রক্রিয়াকে বন্ধুদেশগুলো সমর্থন করায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানান। তিনি এ সময় মানবাধিকার রক্ষায় কাজ করছে উল্লেখ করে বলেন, “বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হেওয়ার জন্য এই বিচার প্রক্রিয়া।” সাভারে ভবন ধসে শ্রমিক হতাহতে বিদেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রতি যে সমবেদনা জানিয়েছে, তাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। দীপু মনি মানবাধিকার বিষয়ে মহাজোট সরকারের গৃহীত উদ্যোগ তুলে ধরে বলেন, “মানবাধিকার রক্ষায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠিত হয়েছে।” তিনি বলেন, “এ সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই ২০০৯ সালের প্রথম মানবাধিকার বিষয়ে প্রতিবেদন জমা দেয় এবং  বাংলাদেশে ফিরে এসে মানবাধিকার বিষয়ে কমিটি করে।” বর্তমান সরকারের সময়ে মানবাধিকার বিষয়ে গুণগত পরিবর্তন সাধিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।   পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এটি সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বের জন্য।

তিনি জানান, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের সংবিধান রচিত হয়েছে এবং ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানকে আগের স্থানে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তিনি আগামী সংসদ নির্বাচনের কথা উল্লেখ করে বলেন, “আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির মাধ্যমে।” বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যার অভিযোগের জবাবে ডা. দীপু মনি জানান, এই সংবিধানের আওতায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিচার বহির্ভূত কোনো কর্মকাণ্ডের সুযোগ নেই। কিন্তু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে বাহিনী তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে মাত্র।

রামু প্রসঙ্গ টেনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনায় জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে সরকার।” এ সময় বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির কথা তুলে ধরেন তিনি। পর্যালোচনা সভায় ডা. দীপু মনি ছাড়াও রামু বিহারের প্রিন্সিপাল মহাথেরো শ্রীমৎ সত্যপ্রিয়, বাংলাদেশ-হিন্দু-বৌদ্ধ- খিস্টান ঐক্য পরিষদের মহাসচিব অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত, বৌদ্ধ ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের কোষাধ্যক্ষ জ্ঞানেন্দ্র চাকমা,  জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান ও মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ হাইকমিশনার নভেনথা পিল্লাই উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনি রোববার লন্ডন থেকে মানবাধিকার বিষয়ক দ্বিতীয় পর্যালোচনা সভায় যোগ দিতে জেনেভা পৌঁছান। বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের দেশে ফেরার কথা রয়েছে।
প্রশ্নোত্তর পর্বে বক্তব্য রাখেন তিনি। এতে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ এবং সেটিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার আইনগত কাঠামো প্রণয়নে সরকার কী কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তা জানতে চায় যুক্তরাজ্য ও নেদারল্যান্ডস। সরকার ঘোষিত নারীনীতির বিরুদ্ধে যেসব বক্তব্য এসেছে, তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করে নরওয়ে এ নীতিমালা বাস্তবায়নের সময়সূচি জানতে চায়। একই সঙ্গে তারা পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন আইন সংশোধন এবং ভূমি সংস্কার ত্বরান্বিত করতে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাও জানতে চায়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে পূর্ণমাত্রায় স্বাধীনতা দেওয়ার লক্ষ্যে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানতে চায় জার্মানি। এছাড়া বেসরকারি সংগঠন ও দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে পেশ করা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আবারও র‌্যাব ভেঙে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নাগরিক জোট সিভিকাস বলেছে, ২০১২ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মোট ৭৮ বার ১৪৪ ধারা জারি করে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হয়নি। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক মানবাধিকার গোষ্ঠী গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস ডিফেন্স বলে, ২০১১-১২ সালে হিন্দু ও বৌদ্ধদের ওপর হামলার অনেক অভিযোগ তারা তদন্ত করে দেখেছে। সে সময় হিন্দু ও বৌদ্ধদের হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুট, প্রার্থনালয় ধ্বংস করাসহ নারীদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনা ঘটে। গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস ডিফেন্স জানায়, এ ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এ সময়ে সহিংসতা বেড়েছে এবং তাদের পৈতৃক ভূমি থেকে উচ্ছেদের ঘটনা ঘটে।

No comments:

Post a Comment